একশত নয় বছরের নাট্য যাত্রায় দেড়শতাধিক প্রযোজনা মঞ্চস্থ করেছে

দিনাজপুর নাট্যসমিতি (দল পরিচিতি)

 

দিনাজপুর নাট্যসমিতি ১৯১৩ সালে ব্রিটিশ শাসনামল চলাকালীন সময়ে প্রতিষ্ঠিত নাট্যদল। সে হিসেবে বর্তমানে দলটির বয়স একশত নয় বছর। বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমি দলটিকে অন্যতম শতবর্ষী নাট্যদল হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছে এবং সেই সাথে ভূষিত করেছে সম্মানজনক ‘শিল্পকলা একাডেমি’ পদকে। স্বাধীন ভাবে থিয়েটার চর্চার লক্ষ্যে নাট্যদলটি শতবর্ষ আগে তৎকালীন মহারাজার সরাসরি তত্ত্বাবধানে যাত্রা শুরু করেছিল।
বাংলার বহু উল্লেখযোগ্য সাংস্কৃতিকব্যক্তিত্ব ইতিহাসের ধারাবাহিকতায় দিনাজপুর নাট্যসমিতির এই দীর্ঘ যাত্রাপথে কখনো না কখনো, কোন না কোনভাবে সংযুক্ত হয়েছিলেন নাট্যদলটির সাথে।

মন্মথ রায়, বিপিন চন্দ্র পাল, মুকুন্দ দাস, পি.সি. সরকার, শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়, তারাশংকর বন্দ্যোপাধ্যায়, কুমার রায়, শিবপ্রসাদ কর, এম.আর.আক্তার মুকুল, নিতুন কুন্ডু, সুভাষ দত্ত, রাজেন তরফদার প্রমুখ উজ্জ্বলতম ব্যক্তিত্বের স্পর্শে ধন্য হয়েছে দিনাজপুর নাট্যসমিতি শতবর্ষ জুড়ে।
দিনাজপুর নাট্যসমিতি তৎকালীন সময়ে কলকাতার নবনাট্য আন্দোলনের সাথে সরাসরি যুক্ত ছিল। স্বাধীনতার পূর্ব পর্যন্ত প্রতি শনিবার সাপ্তাহিক ছুটির আগের দিন নিয়মিত নাট্যমঞ্চায়নের ঐতিহ্য ছিল দিনাজপুর নাট্যসমিতির। প্রায় প্রতিষ্ঠাকালীন সময় হতেই টিকিটের বিনিময়ে নাটক প্রদর্শনীর ঐতিহ্য অব্যাহত রেখেছে দিনাজপুর নাট্যসমিতি।

১৯৬৩ সাল থেকে দিনাজপুর নাট্যসমিতি তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের মধ্যে প্রথম মাস-ব্যাপী নাট্যোৎসব আয়োজনের দায়িত্ব গ্রহণ করে। যা স্বাধীনতা পরবর্তী কালেও অব্যাহত আছে। ১৯৬৩ থেকে ২০১৮ পর্যন্ত দীর্ঘ পঞ্চান্ন বছরে প্রতিষ্ঠানটি ২২টি মাস-ব্যাপী জাতীয় ও আন্তর্জাতিক নাট্যোৎসব ও প্রতিযোগিতার আয়োজন করেছে। গত ২০২০ এর পর করোনা অতিমারীর কারণে পরবর্তী নাট্যোৎসব আয়োজন আর সম্ভব হয়নি।

স্বাধীনতা উত্তরকালে গত পঞ্চাশ বছরে দিনাজপুর নাট্যসমিতি ছিল সর্বদাই কর্ম-মুখর, প্রাঞ্জল, উৎসবময়।

একের পর এক সৃজনশীল প্রযোজনা নির্মাণের পাশাপাশি অংশগ্রহণ করে একাধিক জাতীয় ও আন্তর্জাতিক নাট্যোৎসবে।

নাট্যসমিতির ‘ক্যাপ্টেন হুররা’ জাতীয় নাট্যোৎসবে অংশগ্রহণ করে জাতীয়ভাবে প্রথম শ্রেণীর দল হিসেবে স্বীকৃতি লাভ করে। ‘কনক সরোজিনী’ প্রযোজনাটি বাংলাদেশের প্রতিনিধি স্বরূপ ভারতের কোলকাতা, চন্দননগর, রায়গঞ্জ, বালুরঘাট, কালিয়াগঞ্জ-এ সফল মঞ্চায়ন সহ ব্যাপক সুনাম অর্জন করে। এছাড়াও বিভিন্ন প্রযোজনা নিয়ে নাট্যসমিতি বাংলাদেশের রাজধানী ঢাকা সহ বিভিন্ন জেলা শহরে অসংখ্য নাট্যোৎসবে অংশগ্রহণ করে অর্জন করে বিপুল স্বীকৃতি ও সম্মান।

নাট্যসমিতি ‘হিং টিং ছট‘ শিশুনাটক প্রযোজনার মধ্য দিয়ে শুরু করে শিশুনাট্যের পথে আর এক নবযাত্রা। ২০২০ সালে করোনাকালীন বন্ধ্যাত্বে যখন সারা দেশের প্রায় সকল নাট্যচর্চা স্থবির তখন নাট্যসমিতি তার ‘স্বপ্নভঙ্গের রঙ্গমঞ্চ’ নাটকটি নিয়ে ফিরে আসে মঞ্চে।

করোনা উত্তর কালে নাট্যসমিতির প্রযোজনায় মঞ্চস্থ হয় পথনাটক ‘তেঁতলিবাবা’, ও ভাষা আন্দোলনের নাটক ‘মুনীরের লাশ’। ২০২১ সালে করোনা অতিমারী চলাকালীন শুরু হয় রবিঠাকুরের ‘রক্তকরবী’ অবলম্বনে সমকালীন বিশ্বের নতুনতর আর্থ-রাজনৈতিক ব্যাখ্যায় ‘নন্দিনীর পালা’র কাজ। নাটকটি অতিমারী সহ নানান স্থবিরতার পাশ কাটিয়ে দর্শকসম্মুখে মঞ্চস্থ হতে যাচ্ছে।

এই একশত নয় বছরের নাট্য যাত্রায় দিনাজপুর নাট্যসমিতি দেড়শতাধিক প্রযোজনা মঞ্চস্থ করেছে।

 

নাট্যসমিতির কিছু গুরুত্বপূর্ণ নাট্য প্রযোজনা:

[১৯১৩-১৯২৫]
চন্দ্রগুপ্ত, আবু হোসেন, হরিশচন্দ্র, জয়দ্রথ, প্রফুল্ল, কর্ণার্জুন, শ্রীকৃষ্ণ, উত্তরা, ফুল্লরা, সীতা, সিন্ধুবিজয়, কিন্নরি, দেবলা-দেবী, পরদেশী, শ্রীদুর্গা, বিত্রাসুর, চাঁদ সওদাগর, স্বর্ণলঙ্কা।

[১৯২৬-১৯৩৫]
প্রতাপাদিত্য, সাজাহান, সুলতান, পলাশীর পরে, মিশর কুমারী, দেবী চৌধুরানী, রণজিৎ সিঙ, রাজা নন্দকুমার, হায়দার আলী, টিপু সুলতান, কেদার রায়, আলমগীর।

[১৯৩৬-১৯৪২]
বৈকুন্ঠের উইল, গোড়ায় গলদ, জনা, বিষবৃক্ষ, চির কুমার সভা, শেষ রক্ষা, পথের শেষে, দুই মানুষ, রামের সুমতি, পতিব্রতা, সাবিত্রি, ক্ষণা।

[১৯৪৩-১৯৪৭]
বঙ্গে বর্গী, সিরাজদ্দৌলা, নীল দর্পণ, মীর কাশিম, কারাগার, নতুন প্রভাত, কালিন্দী, আলী বাবা।

[১৯৫৪-১৯৬৮]
অভিনয় নয়, তাই তো, তেরোশো পঞ্চাশ, নবান্ন, মাটির মায়া, দ্বীপ শিখা, দুখীর ইমান, লবনাক্ত, কাঞ্চন রঙ্গ, বাস্তু ভিটা, ছেঁড়া তার, মানময়ী গার্লস স্কুল, সামন্তক মনি, দ্বীপান্তর, জীবনটাই নাটক, উল্কা, কালের পদধ্বনি, ক্ষুধা, এরাও মানুষ।

[১৯৭১-২০০০]

কিংশুক যে মরুতে, সম্রাট, ভেঁপুতে বেহাগ, অন্ধকারের আয়না, ইতিহাস কাঁদে, ভূমিকম্পের আগে, দুই বোন, ফিঙ্গার প্রিন্ট, দেওয়ান গাজির কিস্সা, ভূমিকম্পের পরে, বাকি ইতিহাস, সেনাপতি, ক্যাপ্টেন হুররা, যদিও সন্ধ্যা, ত্রিরত্ন, দ্যাশের মানুষ, ক্ষত বিক্ষত, এখনো কৃতদাস, পাথর, সাজানো বাগান, নেপেন দারোগার দায়ভার, চোখে আঙ্গুল দাদা।

[২০০০- ২০২২]

ডিম্ব কাব্য, রাজ কার্য, মেহেরজান আরেকবার, কবর, আ-মরি বাংলা ভাষা, নতুন মানুষ, তৃতীয় পুরুষ, দর্পন সাক্ষী, মধুরেনো, রাতের অতিথি, স্বাধীনতার সংগ্রাম, এখনও যুদ্ধ, লাল সূর্যের দেশে, ক্ষ্যাপা পাগলার প্যাচাল, হত্যারে, হত্যার শিল্পকলা, অরাজনৈতিক, দায়বদ্ধ, মানুষ, সুবচন নির্বাসনে, যামিনীর শেষ সংলাপ, উনিশো একাত্তর, আতর আলীদের নীলাভ পাট, মেরাজ ফকিরের মা, শুনো হে লখিন্দর, সাদা কাগজ, কনক সরোজিনী, স্বপ্নভঙ্গের রঙ্গমঞ্চ, বীরবান্টা, হিং টিং ছট, তেঁতলিবাবা, মুনীরের লাশ, নন্দিনীর পালা, স্বর্ণঘোর (মহড়ারত), দেওয়ান গাজীর কিস্সা (মহড়ারত)।

নির্দেশকের কথা:

করোনা অতিমারীর পর রবিঠাকুরের ‘রক্তকরবী’ অবলম্বনে সমকালীন বিশ্বের নতুনতর আর্থ-রাজনৈতিক ব্যাখ্যায় সম্পাদিত হয় ‘নন্দিনীর পালা’। এ নাটকে রাজা ধনতন্ত্রের আর রঞ্জন সমাজতন্ত্রের রূপক। ১৯২৩ সালে রবীন্দ্রনাথ যখন এ নাটক লিখছেন তখন ধনতন্ত্রের জয়গান ছড়িয়ে পড়েছে দিকে দিকে। প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পর ফ্যাসিবাদী শক্তি মাথা চাড়া দিচ্ছে, আর পটভূমি তৈরী হচ্ছে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের। উত্থান ঘটছে সমাজতন্ত্রের।
‘রক্তকরবীর’ সমস্ত পালাটি নন্দিনী বলে এক মানবীর ছবি।

রবীন্দ্রনাথ এ নাটকের প্রস্তাবনায় নিজেই বলেছেন “আজ আপনাদের বারোয়ারি-সভায় আমার ‘নন্দিনী’র পালা অভিনয়”। আমরা তাই এ পালার নাম দিয়েছি ‘নন্দিনীর পালা’। এ পালায় নন্দিনী স্বয়ং প্রকৃতির রূপক। আর প্রকৃতি সবসময়ই সাম্যের পক্ষে, সমাজতন্ত্রের পক্ষে। আধুনিক সভ্যতার যুগ হলো হরণের যুগ। কর্ষণজীবীর সম্পদ এখানে আকর্ষণজীবীরা হরণ করে। লুট করে। ধনতন্ত্রের রাজার ইতিহাস তাই লুটতরাজ, খুনজখম, হত্যা বা গুপ্তহত্যার ইতিহাস।

এ পালায় রঞ্জনের মৃত্যু হয় রাজার হাতে। অর্থাৎ ধনতন্ত্রের হাতে সমাজতন্ত্রের রাজনৈতিক মৃত্যু। রবীন্দ্রনাথের মৃত্যুর প্রায় পঞ্চাশ বছর পরে বর্তমান পৃথিবীতে সত্যি সত্যি রাজনৈতিক মৃত্যু হয় সমাজতন্ত্রের, ধনতন্ত্রের হাতে। তবে কি রবীন্দ্রনাথ ভবিষ্যৎ দ্রষ্টা ছিলেন? তিনি নন্দিনীর হাত দিয়ে রঞ্জনের চূড়ায় পরিয়ে দিয়েছিলেন নীলকণ্ঠ পাখির পালক। আর নন্দিনী দিয়েছিল ধনতন্ত্রের রাজার বিরুদ্ধে বিদ্রোহের ডাক।

নিজের মৃত্যু সুনিশ্চিত জেনেও নন্দিনী তার বুকের রক্তে ছড়িয়ে গেছে রক্তকরবীর রঙে বিপ্লবের ব্যরতা। আর ধনতন্ত্রের রাজা? সেও যুদ্ধ ঘোষণা করেছে। নিজেরই বিরুদ্ধে। নন্দিনীর পিছু পিছু সেও ছুটে গেছে মানব মুক্তির ডাকে। এখানেই রবীন্দ্রনাথ দাঁড়ি টেনেছেন। আর আমাদের ফেলে দিয়ে গেছেন এক অদ্ভুত প্রশ্নের মুখে, তারপর কি হলো? হ্যা, সমাজতন্ত্রের রাজনৈতিক মৃত্যুর পর বিশ্ব অর্থনীতিতে ধনতন্ত্রও তার চরিত্র বদলাতে শুরু করেছে, জন্ম হয়েছে সামাজিক-ধনতন্ত্রের বা মিশ্রঅর্থনীতির।

যেখানে রাষ্ট্র মানুষের প্রায় সব নিত্য চাহিদার দায়িত্ব যেমন নেবে, আবার ব্যক্তি সম্পদের অনিয়ন্ত্রিত পাহাড় গড়ে তোলাকেও নিয়ন্ত্রন করবে রাষ্ট্র। জানিনা, রবীন্দ্রনাথ রাজা ও রঞ্জনের দ্বন্দ্বের পর এমন একটা অর্থনৈতিক রাষ্ট্রের কথা কল্পনা করেছিলেন কিনা? ১৯২৩ থেকে ২০২২ একশত বছর আগে লেখা রক্তকরবী আমাদের ‘নন্দিনীর পালা‘ তাই আজো প্রাসঙ্গিক, হয়তো প্রাসঙ্গিক থাকবে আরো বহু শত বছর।

Nandinir pala
Nandinir pala

কলাকুশলী:

মূল রচনা: রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
সম্পাদনা ও নির্মাণ: সম্বিত সাহা
প্রযোজনা ব্যবস্থাপক: সেখ ছগীর আহাম্মদ কমল

অভিনয়:

রঞ্জন: এম.ডি ওয়াসিফ
বিশুবাউল। সেখ ছগীর আহাম্মদ কমল
অধ্যাপক: জিয়াউল হক সিজার
কিশোর: অদ্ভুর ভট্টাচার্য
গোকুল: রুবায়েত হোসেন রাব্বি
রাজা: কনক চন্দ্র রায়
ফাগুলাল: টংকনাথ অধিকারী
চন্দ্রা: কোরাইশা আক্তার স্মৃতি
সর্দার: জাহেদ-উন-নবী
গোঁসাই: অমিত দাস/ চন্দন সরকার
পালোয়ান: মোঃ তরিকুল আলম
প্রহরী: আসাদুজ্জামান বাবু
নন্দিনী: সুপ্রীতি গোস্বামী
পরিকল্পনা ও নির্মান: জাহেদ-উন-নবী
আলোঃ
পরিকল্পনা ও প্রয়োগ: চন্দন সরকার
আবহ সঙ্গীত:
পরিকল্পনা ও প্রয়োগ: অমিত দাস
পোষাক ও মঞ্চসামগ্রী: আসাদুজ্জামান বাবু
রূপসজ্জা: টংকনাথ অধিকারী
প্রচার ও প্রকাশনা: নুরুল মতিন সৈকত
প্রচার ও প্রকাশনা সম্পাদক, দিনাজপুর নাট্যসমিতি।
সার্বিক তত্ত্বাবধান: মো: তরিকুল আলম
সহ নাট্যাধ্যক্ষ, দিনাজপুর নাট্যসমিতি।

কৃতজ্ঞতায়:

কাজী বোরহান উদ্দীন,
নাট্যাধ্যক্ষ, দিনাজপুর নাট্যসমিতি।
রেজাউর রহমান রেজু,
সাধারণ সম্পাদক, দিনাজপুর নাট্যসমিতি:
চিত্ত ঘোষ
সভাপতি, দিনাজপুর নাট্যসমিতি।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Scroll to Top