দিনাজপুর নাট্য সমিতির সদস্য ছয় নিবেদিত প্রাণের বিদায়ে শোক সভা অনুষ্ঠিত
দিনাজপুরের ঐতিহ্যবাহী শতবর্ষের নাট্য প্রতিষ্ঠান দিনাজপুর নাট্য সমিতির ৬ সদস্যদের চির বিদায়ে শোক সভা অনুষ্ঠিত হয়েছে নাট্য সমিতির মঞ্চে মঙ্গলবার রাতে।
দিনাজপুর নাট্য সমিতির সহ-সভাপতি মোঃ সহিদুল ইসলাম শহিদুল্লাহ’র সভাপতিত্বে স্বাগত বক্তব্য রাখেন নাট্য সমিতির সাধারন সম্পাদক রেজাউর রহমান রেজু। নাট্য সমিতির প্রয়াত ৬ সদস্যরা হলেন বিশিষ্ট ক্রীড়া সংগঠক জিনাত আরা চৌধুরী মিলি, সমাজসেবক ও সংগঠক সুনীল চক্রবর্তী, নাট্যশিল্পী আব্দুল কুদ্দুস তরিদ, সাংবাদিক ও নাট্য কর্মী শিশির দত্ত, গণসংগীত শিল্পী সত্য ঘোষ ও বিশিষ্ট সামাজিক-মানবাধিকার কর্মী এ্যাডঃ লিয়াকত আলী।
শোক সভার শুরুতে শোক প্রস্তাব পাঠ করেন নাট্য সমিতির সহ-সাধারন সম্পাদক কামরুল হুদা হেলাল। সুনীল চক্রবর্তীর জীবন বৃত্তান্ত নিয়ে আলোচনা করেন নবরূপীর সহ-সভাপতি মানস ভট্টাচার্য্য। জিনাত আরা চৌধুরী মিলি’র জীবন বৃত্তান্ত নিয়ে আলোচনা করেন নাট্য সমিতির নির্বাহী সদস্য সেতারা বেগম।
আব্দুল কুদ্দুস তরিদ এর জীবন বৃত্তান্ত নিয়ে আলোচনা করেন নাট্য সমিতির উপাধ্যক্ষ তরিকুল আলম তরু, শিশির দত্তের জীবন বৃত্তান্ত নিয়ে আলোচনা করেন দোলনচাঁপা সঙ্গীত নিকেতনের সাধারন সম্পাদক প্রদীপ ঘোষ ও নয়ন বার্টেল।
সত্য ঘোষনর জীবন বৃত্তান্ত্য নিয়ে আলোচনা করেন তার বড় ভাই ও দিনাজপুর নাট্য সমিতির সভাপতি বিশিষ্ট সাংবাদিক চিত্ত ঘোষ এবং নাট্য সমিতির সহ-সাধারন সম্পাদক শেখ ছাগির আহমেদ কমল।
এ্যাডঃ লিয়াকত আলীর জীবন বৃত্তান্ত নিয়ে আলোচনা করেন রাজিয়া সুলতানা পলি।
এছাড়া আরও স্মৃতি চারণমূলক বক্তব্য রাখেন সুলতান কামাল উদ্দিন বাচ্চু, এ্যাডঃ ইমামুল ইসলাম, রহমতউল্লাহ রহমত, এ্যাডঃ মেহেরুল ইসলাম, সৈয়দ মোসাদ্দেক হোসেন লাবু, সুজন কুমার দে। এসময় উপস্থিত ছিলেন সুনীল চক্রবর্তীর পুত্র বাপ্পি চক্রবর্তী, সত্য ঘোষের পুত্র শুসময় ঘোষ, আব্দুল কুদ্দুস তরিদ এর পুত্র অর্ঘ।
সভার শুরুতে নজরুল সঙ্গীত পরিবেশন করেন নজরুল ইসলাম। শোক সভায় বক্তারা বলেন, নাট্য সমিতির প্রয়াত নিবেদিত প্রাণ এই ৬ জন সদস্য কোন না কোনভাবে সহায়তা করেছিল বলেই নাট্য সমিতি একের পর এক বাধা পেড়িয়ে যাচ্ছে। এই মানুষগুলোকে আমরা খুব অল্প সময় হারিয়েছি। তাদের নিবেদিত কর্মপ্রেরণা আমাদের হৃদয়ে চিরদিন জাগ্রত থাকবে। সঞ্চালকের দায়িত্ব পালন করেন প্রভাষক হারুন-অর-রশিদ।
জিনাত আরা মিলি
জন্ম: ১৩ অক্টোবর ১৯৫৬
মৃত্যু: ২৪ নভেম্বর ২০২৫
দিনাজপুর শহরের বাহাদুর বাজারে জন্ম এবং বেড়ে ওঠা। দিনাজপুর গভ: গার্লস স্কুল থেকে এসএসসি এবং ইডেন মহিলা কলেজ, ঢাকা থেকে উচ্চ মাধ্যমিক পাস করেছেন। ১৯৭৪ সালের ২৪ এপ্রিল দিনাজপুরের সম্ভ্রান্ত পরিবারের সন্তান আজিজুল ইমাম চৌধুরীর সাথে তার বিয়ে হয়। তাদের দুই ছেলে এবং এক মেয়ে। তিনি দিনাজপুর লেডিস ক্লাবের সেক্রেটারীর দায়িত্ব পালন করেছেন দীর্ঘদিন। এছাড়াও তিনি জেলা মহিলা ক্রীড়া সংস্থার সম্পাদক, উদীচী দিনাজপুর জেলা সংসদের সহ-সভাপতি সহ দিনাজপুরের বিভিন্ন সামাজিক সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠানের সাথে জড়িত ছিলেন। তিনি দিনাজপুর নাট্য সমিতির দাতা সদস্য ছিলেন। তাঁর মৃত্যুতে আজকের শোকসভায় গভীর শোক ও সমবেদনা জ্ঞাপন করছি।
সুনীল চক্রবর্তী
জন্ম: ১৯ জুলাই ১৯৫২
মৃত্যু: ৩১ মার্চ ২০২৬
তিনি দিনাজপুর শহরের পাহাড়পুর এলাকার অধিবাসী। তিনি একাডেমি স্কুল হতে এসএসসি এবং দিনাজপুর সরকারি কলেজ হতে এইচএসসি পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হন। ১৯৭৩ সুলোচনা চক্রবর্তীর সাথে তার বিয়ে হয়। তার এক ছেলে বাপ্পী চক্রবর্তী এবং মেয়ে সুমি ভট্টাচার্য্য। তারা চার ভাই এবং এক বোন। তিনি ইলেকট্রনিক ঠিকাদারী ব্যবসা করতেন। তিনি দিনাজপুর নাট্য সমিতির আজীবন সদস্য, দিনাজপুর নবরূপীর সহ-সভাপতি, দিনাজপুর ইনষ্টিটিউটের সাধারণ সম্পাদক, অরবিন্দ শিশু হাসপাতালের সহ-সভাপতি ও পরিবার পরিকল্পনা সমিতির আজীবন সদস্য ছিলেন। এছাড়া তিনি বাংলাদেশ হিন্দু, বৌদ্ধ, খৃষ্টান ঐক্য পরিষদের সভাপতি ও রাজ দেবোত্তর এষ্টেটের সদস্য ছিলেন। তাঁর মৃত্যুতে আমরা গভীর শোক ও সমবেদনা জ্ঞাপন করছি।
মরহুমা এ্যাডভোকেট লিয়াকত আলী
জন্ম: ৬ নভেম্বর ১৯৫৯
মৃত্যু: ৭ মার্চ ২০২৬
মরহুম এ্যাডভোকেট লিয়াকত আলী’র জন্ম ৬ নভেম্বর ১৯৫৯ খ্রীস্টাব্দে ও মৃত্যু ৭ মার্চ ২০২৬ খ্রীষ্টাব্দে। তিনি ছিলেন মরহুম ডাক্তার রিয়াজ উদ্দিন আহমেদ, অবসরপ্রাপ্ত আবাসিক মেডিকেল অফিসার মহাশয়ের জ্যেষ্ঠ পুত্র। তাঁর আবাস ছিল দিনাজপুর শহরের নিউ টাউন ১ নম্বর সেক্টরে আর আদি নিবাস ছিল চিরিরবন্দর উপজেলার ফতেজংপুর ইউনিয়নের ফতেজংপুর গ্রামে।
তিনি রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় থেকে আইন বিষয়ে সাফল্যের সাথে অনার্স মাস্টার্স শেষ করে দিনাজপুর জেলায় আইনজীবী পেশা শুরু করেন এবং আমৃত্যু সেই পেশায় নিয়োজিত ছিলেন। তিনি দিনাজপুরের একজন একনিষ্ঠ রাজনৈতিক, মানবাধিকার, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক কর্মীও ছিলেন বটে।
তিনি ছাত্র অবস্থা থেকেই বাম রাজনীতির সাথে সম্পৃক্ত ছিলেন এবং নিবেদিত প্রাণ কর্মী ছিলেন। রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যয়নকালে বাংলাদেশ ছাত্র লীগ (জাসদ) রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় শাখার সাংগঠনিক সম্পাদক ছিলেন পরিণত বয়সে তিনি বাংলাদেশের রাজনীতিতে যোগ দেন এবং স্বাভাবিক ভাবেই জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দল (জাসদ) দিনাজপুর জেলা শাখার সাধারণ সম্পাদক ও পরবর্তীতে সভাপতির দায়িত্ব পালন করেছেন এবং মৃত্যুর আগ পর্যন্ত পালন করে গেছেন।
একসময় তিনি জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দল ( জাসদ) কেন্দ্রীয় কমিটির সম্মানিত সদস্যও ছিলেন। তিনি রাজনীতির পাশাপাশি মানবাধিকার, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত ছিলেন মৃত্যুর পূর্ব মূহুর্ত পর্যন্ত। তিনি দিনাজপুরের মানবাধিকার সংগঠন” ব্লাস্ট”-এর সভাপতি, ” দিনাজপুর নাট্য সমিতি “র একজন সক্রিয় সদস্য ছিলেন।
তিনি দিনাজপুর নাট্য সমিতির নিয়মিত নাটক দেখতেন, নাট্য সমিতির সাধারণ সভাগুলির আলোচনায় অংশগ্রহণ করে নাট্য সমিতির করণীয় ও ভবিষ্যৎ কর্ম পরিকল্পনা গ্রহণের ক্ষেত্রে মূল্যবান মতামত দিতেন। তিনি দিনাজপুরের ঐতিহাসিক গোর-এ-শহীদ বড়মাঠ রক্ষা কমিটির সম্মানিত সদস্য ছিলেন এবং বড়মাঠ রক্ষা করার ক্ষেত্রে সদস্য হিসেবে আলোচনার টেবিলে ও আদালতে সক্রিয় ভূমিকা রেখেছিলেন।
মৃত্যুকালে তিনি স্ত্রী, একমাত্র সন্তান ও অসংখ্য গুণগ্রাহী রেখে ৬৭ বছর বয়সে ৭ মার্চ ২০২৬ খ্রীস্টাব্দ তারিখে আনুমানিক সকাল ১০.০০টায় আমাদের সান্নিধ্য ছেড়ে পরপারে পারি জমান। তাঁর মৃত্যুতে দিনাজপুরের রাজনৈতিক, মানবাধিকার, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক অঙ্গনে অপূরণীয় ক্ষতি হয়ে গেল; বিশেষত দিনাজপুর নাট্য সমিতি হারালো তার একজন শুভাকাঙ্ক্ষী বন্ধুকে।
তাঁর বিদেহী আত্মার চিরশান্তি কামনা করছি।
শোকসভা তারিখ: দিনাজপুর, ২৪ চৈত্র ১৪৩২; ৭ এপ্রিল ২০২৬।