বিশ্ব নাট্য দিবসের প্রেক্ষাপট
১৯৬১ সালের জুনে ভিয়েনায় অনুষ্ঠিত ইন্টারন্যাশনাল থিয়েটার ইন্সটিটিউট (আইটিআই) এর নবম কংগ্রেসে বিশ্ব নাট্যদিবস প্রবর্তনের প্রস্তাব গৃহীত হয়। দিন-তারিখ নির্ধারণ করার প্রশ্ন উঠলে সিদ্ধান্ত নেয়া হয় যে, পরবর্তী বছর (অর্থাৎ ১৯৬২ সালে) প্যারিসে অনুষ্ঠেয় থিয়েটার অব নেশনস্ উৎসবের সূচনার দিনটি (২৭ মার্চ) প্রতিবছর বিশ্ব নাট্যদিবস হিসেবে উদ্যাপিত হবে।
১৯৬২ সাল থেকে দুনিয়াজুড়ে বিশ্ব নাট্যদিবস পালনোৎসব ক্রমে ব্যাপকতা অর্জন করে চলেছে। প্রতিবছর ইন্টারন্যাশনাল থিয়েটার ইন্সটিটিউট নাটক কিংবা সংশ্লিষ্ট ক্ষেত্রের একজন বিশিষ্ট ব্যক্তিকে আমন্ত্রণ জানায় এ উপলক্ষে আন্তর্জাতিক বাণী প্রদান করার জন্য। জাঁ ককতো, আর্থার মিলার, লরেন্স অলিভিয়ের, হেলেনা ভাইগেল, পিটার ব্রুক, পাবলো নেরুদা, রিচার্ড বার্টন, ইউজিন আয়োনেস্কো, মার্টিন এসলিন, ওলে সোয়িন্কা, এডওয়ার্ড অ্যালবি, ভাসলাভ হাভেল, গিরিশ কারনাড, আরিয়ান মুশকিন, অগাস্টো বোয়াল, কার্লোস কেলড্রান, হেলেন মিরেন, পিটার সেলার্স, সামিহা আইয়ুব, ইয়োন ফসে, থিয়োডোরোস টারসোপাউলোস এর মতো খ্যাতিমান ব্যক্তিরা বিভিন্ন বছরে আন্তর্জাতিক বাণী দিয়েছেন। এ বছর বাণী দিয়েছেন আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন যুক্তরাষ্ট্রের অভিনেতা ও পরিচালক ইলিয়াম ডাফো।
জীবন-পরিচিতি
ইলিয়াম ডাফো, যুক্তরাষ্ট্র অভিনেতা ও পরিচালক
ইলিয়াম ডাফো (জন্ম ১৯৫৫) একজন মার্কিন অভিনেতা এবং ভেনিসে অবস্থিত বিশ্বখ্যাত সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠান লা বিএনালে দি ভেনেসিয়া-র নাট্যকলা বিভাগের আর্টিস্টিক ডিরেক্টর। তিনি দ্য ওয়িস্টার গ্রুপ-এর একজন অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা। এই প্রতিষ্ঠান ১৯৭৭ থেকে ২০০৪ সাল পর্যন্ত নিউ ইয়র্কের দ্য পারফর্মিং গ্যারাজ নামে একটি স্বাতন্ত্রিক আভাগার্দ সংস্কৃতির উদ্যোক্তা। ইলিয়াম ডাফো অ্যাকাডেমি অ্যাওয়ার্ডের জন্য মনোনীত হন এবং ভেনিস চলচ্চিত্র
উৎসব, ২০১৮ সালে শ্রেষ্ঠ অভিনেতা হিসাবে কোওপা ভলপি পুরষ্কারে ভূষিত হন। মঞ্চ নাটকের প্রতি নিঃশর্ত আনুগত্য তাঁর শৈল্পিক দর্শন এবং পারফর্মিং আর্টের মূল সঞ্চালক।
বিশ্ব নাট্য দিবসের বাণী ২০২৬
ইলিয়াম ডাফো

আমি একজন অভিনেতা, মূলত চলচ্চিত্র অভিনেতা হিসেবে পরিচিত। তবে আমার আদি ভিত্তি থিয়েটারে গভীরভাবে প্রোথিত। আমি ১৯৭৭ থেকে ২০০৩ পর্যন্ত ওস্টার গ্রুপের সদস্য ছিলাম। যেখানে নিউ ইয়র্ক সিটির দ্য পারফর্মিং গ্যারেজে মৌলিক কাজ নির্মাণ ও প্রদর্শন করতাম এবং যা সারা বিশ্বে প্রদর্শিত হতো। আমি রিচার্ড ফোরম্যান, রবার্ট উইলসন উইলসন এবং রোমিও ক্যাস্টেলুচির সাথে কাজ করেছি | বর্তমানে ভেনিস থিয়েটার বিয়েনাল-এর শিল্পী-পরিচালক হিসেবে কাজ করছি। এই নিয়োগ বিশ্বে চলমান ঘটনাবলী এবং থিয়েটারে ফিরে যাওয়ার অদম্য কাঙ্ক্ষা এই মাধ্যমের অনন্য ইতিবাচক শক্তি এবং গুরুত্বের প্রতি আমাকে বিশ্বস্ত করে তুলেছে।
একেবারে শুরুর দিকে যখন নিউ ইয়র্ক ভিত্তিক থিয়েটার কোম্পানি ওস্টার গ্রুপে কাজ করতাম থিয়েটারের কিছু কিছু প্রদর্শনীতে খুবই কম দর্শক পেতাম। পরিবেশকদের সংখ্যা দর্শকদের চেয়ে বেশি হলে শো বাতিল করার নিয়ম ছিল। কিন্তু আমরা তা কখনও করিনি। কোম্পানির অনেক সদস্যই থিয়েটারে প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত ছিলেন না, বিভিন্ন পেশার মানুষ একত্রিত হয়ে থিয়েটার করতেন। ফলে “শো চলতেই হবে” এমন মূলমন্ত্র আমাদের ছিল না। তবুও দর্শকদের সঙ্গে যোগাযোগ স্থাপনে আমরা ভেতরে থেকে তাগিদ অনুভব করতাম।
আমরা প্রায়ই দিনের বেলা অনুশীলন করতাম এবং সন্ধ্যায় শো করতাম। কখনও কখনও একটি শো নিয়েই বছরের পর বছর কাটাতাম, বিশেষ করে, যখন পুরোনো প্রদর্শনীগুলোর মাধ্যমে জীবিকা নির্বাহ করতে হতো। একটি নাটক নিয়ে বছরের পর বছর কাজ করা প্রায়ই বিরক্তির কারণ হতো এবং রিহার্সেল করাকে কিছুটা ক্লান্তিকরও মনে হতো। তবে এই চলমান শো গুলো সবসময় উত্তেজনাপূর্ণ ছিল, যদিও শুধুমাত্র ছোট পরিসরের দর্শকবৃন্দই আমাদের কাজের প্রতি আগ্রহ ও নিষ্ঠার মূল্য দিতেন। এতে আমি শুধু এইটুকু বুঝতে পারলাম যে, দর্শক যতই কম হোক না কেন, তারা যেভাবে সাক্ষী হিসেবে উপস্থিত থাকে, তা থিয়েটারকে প্রাণবন্ত ও অর্থবহ করে।
যেমন-জুয়া খেলার হলের সামনে লেখা থাকে “জিততে হলে আপনাকে অবশ্যই উপস্থিত থাকতে হবে”। তদ্রুপ থিয়েটারের শক্তি অভিনয়শিল্পী ও দর্শকের সরাসরি অভিজ্ঞতা ভাগ করে নেওয়ার মাঝে নিহিত। সামাজিক এবং রাজনৈতিকভাবে, থিয়েটার কখনোই আমাদের নিজেদের এবং বিশ্বকে বোঝার জন্য এত গুরুত্বপূর্ণ এবং জীবন্ত ছিল না।
বর্তমান সময়ে সবচেয়ে জটিল ও বিতর্কিত বিষয় হলো নতুন প্রযুক্তি এবং সামাজিক নেটওয়ার্কিং, যা সংযোগের প্রতিশ্রুতি দেয় বটে, তবে আদতে মানুষকে করে তোলে বিচ্ছিন্ন ও একাকী। আমি প্রতিদিন কম্পিউটার ব্যবহার করি, যদিও আমার কোনও সামাজিক মাধ্যম নেই। একজন অভিনেতা হিসেবে আমার নাম গুগল করেছি, এবং তথ্যের জন্য কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার (এআই) পরামর্শও নিয়েছি। তবে, আপনি দৃষ্টিহীন না হলে দেখতে পাবেন যে, মানব-সম্পর্ক ধীরে ধীরে প্রযুক্তিতে প্রতিস্থাপিত হচ্ছে। যদিও কিছু প্রযুক্তি আমাদের ভালো সেবা দিতে পারে, কিন্তু যোগাযোগের অন্য প্রান্তে কে বা কারা আছে, তা না জানার সমস্যাও গভীর। এবং একই সঙ্গে এটি মূল সত্য ও বাস্তবতা জানার ক্ষেত্রে একটি সংকট সৃষ্টি করে। যদিও প্রযুক্তি প্রশ্ন উত্থাপন করতে পারে, কিন্তু খুব কমই মানব বিস্ময়ের সম্পূর্ণ অনুভূতি ধারণ
করতে পারে যা থিয়েটার সৃষ্টি করতে সক্ষম। একটি বিস্ময় বা মনোযোগ, ও সম্পৃক্ততা দর্শকদের স্বতস্ফূর্ত উপস্থিতি এবং প্রতিক্রিয়ার মাধ্যমেই পরিপূর্ণভাবে তৈরি হয়।
একজন অভিনেতা এবং থিয়েটার নির্মাতা হিসেবে আমি থিয়েটারের শক্তিতে বিশ্বাসী। এমন একটি বিভক্ত, নিয়ন্ত্রণমূলক এবং সহিংস বিশ্বে, থিয়েটার নির্মাতাদের চ্যালেঞ্জ হলো থিয়েটারকে কেবলমাত্র একটি বাণিজ্যিক উদ্যোগ বা ঐতিহ্য সংরক্ষণের মাধ্যম বিবেচনা না করে এর মজ্জাগত শক্তি ব্যবহার করে মানুষ, মানবগোষ্ঠী, ও সংস্কৃতির মধ্যে সংযোগ স্থাপন করা। এবং সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ, আমরা কোথায় এগুচ্ছি সে-প্রশ্ন করা।
মহান থিয়েটারের কাজ হলো আমাদের চিন্তাকে চ্যালেঞ্জ করা এবং কল্পনা জগতকে উস্কে দেয়া।
আমরা সামাজিক প্রাণী এবং পৃথিবীর সাথে সম্পর্ক স্থাপনের জন্য জৈবিকভাবে সৃষ্ট। প্রতিটি ইন্দ্রিয় একটি নতুন সাক্ষাতের প্রবেশদ্বার, এবং এই সাক্ষাতের মাধ্যমে আমরা আমাদের পরিচয়কে আরও স্পষ্টভাবে বুঝতে পারি। গল্প বলা, নান্দনিকতার প্রকাশ, ভাষার ব্যবহার, নানা সামাজিক আন্দোলন, ও দৃশ্য পরিকল্পনার মাধ্যমে থিয়েটার একটি পূর্ণাঙ্গ শিল্প হিসেবে আমাদের দেখাতে পারে কী ছিল, কী আছে এবং আমাদের আগামী বিশ্ব কেমন হতে পারে।
ভাষার: আবদুস সেলিম, সভাপতি আইটিআই, বাংলাদেশ সেন্টার
বিশ্ব নাট্যদিবস: জাতীয় বাণী
মফিদুল হক

বাংলার জনজীবন ও বাংলার নাটক, হাজার বছর পেরিয়ে হাজারো বাধা উজিয়ে চলেছে পরস্পরের হাতে হাত রেখে। এর রূপবদল ঘটেছে অনেক, বহু দিক দিয়ে নাটক হয়েছে সমৃদ্ধবান, অন্যদিকে নাট্যস্রোতে বদ্ধতাও এসেছে কখনো কখনো, চোরাটান কিংবা আবিলতা নাটককে পথভ্রষ্ট করতে হয়েছে উদ্যত, এর জঙ্গমতা হরণ করবার শঙ্কা তৈরি করেছে। তবুও পলিমাটির বঙ্গভূমিতে জীবন ও সভ্যতা যেমন চলমান, নাটকও তেমনি ছিল প্রবহমান। হাজার বছরের সেই অভিযাত্রা যখন আমরা স্মরণে রাখি তখন এই প্রত্যয়ে উদ্দীপ্ত না হয়ে পারি না যে নাটকের পরাভব নেই। হতে পারে নাট্যশিল্পীর তরবারিটি টিনের, ক্ষমতা তার নাট্যনিবেদনের শূন্য পরিসর বা এম্পটি স্পেসে সীমিত কিন্তু বাস্তবজীবনের ডামাডোল থেকে কল্পনায় ডানা-মেলা নাটক যত অলীক মনে হোক ততোধিক অলৌকিক ক্ষমতা ধারণ করে এই শিল্প। নাট্যশিল্পের রহস্যময়তাই এর প্রাণ, লৌকিক ও অলৌকিকের খেলার মধ্য দিয়েই নাটকের অস্তিত্বময়তা ও বিস্তার, হাজার বছর ধরে যেই শিল্পের অভিযাত্রা অব্যাহত রয়েছে এই গাঙ্গেয় অববাহিকার পলিমাটির দেশের জীবনযাত্রার সঙ্গে সমতালে।
বাংলা ভাষা ও ভাষাভিত্তিক নৃতাত্ত্বিক জনজাতির বিকাশের সঙ্গে অঙ্গাঙ্গীভাবে জড়িয়ে আছে বাংলানাট্য। হাজার বছর আগের যে চর্যাপদকে বাংলাভাষার আদিরূপ হিসেবে শনাক্ত ও সমাদর করা হয় তার সাথে জড়িত ছিল জনমানুষের ধর্মাচার, ধর্মপালন ও সাধনপদ্ধতি। সম্মিলিতভাবে গীতবাদ্য সহযোগে লোকসমাজ যে-ভাষায় পরমের প্রতি অন্তরের আকুতি নিবেদন করতো সেটাই চর্যাপদ, বৌদ্ধ গান ও দোহা। এই কৃত্য বস্তুত লোকনাট্য, যেখানে রয়েছে নাট্যপরিসর দেবগৃহের গর্ভ কিংবা অঙ্গন, রয়েছে দৃশ্যসজ্জা – আরাধ্য দেবতার মূর্ত রূপ ও আরো বিবিধ উপাচার, রয়েছে আবহসঙ্গীত – বাদ্যযন্ত্র ও বাদকদল, আছেন দর্শককূল- পুণ্যপ্রত্যাশী যে অন্তজ্যরা সমবেত হন প্রার্থনা সভায়। আরো যদি খুঁজি নাটকের উপাদান তবে বুঝব নির্দিষ্ট সময়ে শুরু হয় এই নাট্যকৃত্য, এমনকি ধ্বনিত হয় শুরুর সংকেত, শঙ্খবাদন অথবা ঢোলকবাদ্যে। সর্বোপরি এই নাট্যক্রিয়ায় প্রাণ সঞ্চারের জন্য রয়েছে গায়ক-গায়িকার দল, চর্যার পদসমূহ বা নাটকের স্ক্রিপ্ট সুধারসে যারা প্রাণবন্ত করেন নৃত্য ও গীতে। চর্যার পদেও তাই দেখি নাটকের স্বীকৃতি, “নাচন্তি বাজিল গান্তি দেবী/বুদ্ধ নাটক বিসমা হোই।”
বাংলা নাটকের জন্মকাল ও এর পরবর্তী নাট্যসূত্রগুলো আমরা বিস্মৃত হয়েছিলাম নানা কারণে। তবে নিজস্বভাবে বিশিষ্টরূপে বাংলার নাট্যধারা তো প্রবহমান ছিল। বাংলা থেকে বিতাড়িত বৌদ্ধমত আশ্রয় খুঁজে পেয়েছিল নেপালের রাজদরবারে, তিব্বতের সাধনক্ষেত্রে এবং দূর থেকে দূরে চীনে, কোরিয়ায়, মঙ্গোলিয়ায়, জাপানে। বাঙালি পণ্ডিত অতীশ দীপঙ্কর দূরপ্রাচ্যে যে প্রভাব বিস্তার করেছিলেন সেটা বাঙালির সাধনা ও সংস্কৃতির রাজ্যসীমা পেরিয়ে যাওয়ার দৃষ্টান্ত মেলে ধরে। অনুমান করতে পারি এই সূত্রে বাংলা নাটকেরও হয়েছে আন্তর্জাতিকীকরণ।
মধ্যযুগে শ্রীচৈতন্য মন্দিরের গর্ভগৃহ থেকে সাধনমার্গরীতি নিয়ে এলেন পুরোহিততন্ত্রের বাইরে, সাধারণজনের কাতারে, জাতপাতের ভেদ অতিক্রমকারী যে সাধনপদ্ধতির অবলম্বন হয়েছিল গান এবং গানের সম্মিলিত নিবেদন। বাঙালির অন্তরের সুর রূপ পেল কীর্তনগানে, গীতনৃত্যবাদ্যে এর পরিবেশনা ক্ষেত্রবিশেষে রূপ নিল পথযাত্রায়, গায়কদল রাধাকৃষ্ণের প্রেমোপাখ্যান নিবেদন করে চলে লোকসমাজের মধ্যে, যা পরবর্তীকালে রোপণ করেছিল যাত্রাশিল্পের বীজ।
বৌদ্ধ তান্ত্রিকতা, চৈতন্যদেবের ভক্তিময়তা ও সুফি ঔদার্যের মিলনে মধ্যযুগের ইসলামের ধর্মাচার থেকে জন্ম নিয়েছিল বাউল গান, যা উপচে পড়েছিল ফানা প্রত্যাশী গুরু ও ভক্তের নৃত্যগীতমুখরতায়। এই সাথে যুক্ত হয়েছিল পারস্য কিংবা আরবভূমি থেকে আগত মিথ ও কিসসা-কাহিনি, যা রূপ নিয়েছিল পালাগানে ও আরো নানা নাট্যরীতিতে।
বাংলার এই নাট্য ঐতিহ্য অবহেলার শিকার হয়েছিল দীর্ঘ ঔপনিবেশিক শাসনে, তবে নাটকের প্রাণ সজীব ছিল লোকসমাজে এবং সেখান থেকে নতুন উপাদান ও সৃষ্টিবীজ নিয়ে নাটকের বহমানতা কেউ ঠেকিয়ে রাখতে পারেনি। আজ একবিংশ শতকের দুই দশকাধিককাল পেরিয়ে আমরা নাটকের সংকট ও সঞ্জীবনী সম্ভাবনা দুইয়ের দোলাচলের মধ্য দিয়ে চলছি। এই সময়ে শিল্পের মশাল হাতে পথ চলবার দিশা নাট্যশিল্পীরা তাদের মতো করে খুঁজে নেবেন। ঐতিহ্য যেমন তাকে যোগাবে সৃষ্টিশীল উপাদান, যা সমকাল ও ভাবীকালের নিরিখে যাচাই-বাছাই ও নবায়ন করে নিতে হবে, তেমনি এটাও গুরুত্ববহ কেবল জাতীয় গণ্ডিতে আবদ্ধ থাকলে চলবে না, শেকড় থাকবে মাটিতে কিন্তু ডানা মেলতে হবে উদার আকাশে। বাংলা নাটক দীর্ঘ পথপরিক্রমণে আকাশ ও মাটির সম্মিলন তৈরি করে চলেছে, সেই সমীকরণ আজ আরো জরুরি হয়ে উঠেছে। বাংলার নাট্য আপন শক্তিতে আলিঙ্গন করবে বিশ্বনাট্য ঐতিহ্য, একই সাথে বাংলা নাট্য সমৃদ্ধ করবে বিশ্বনাটককে। এমন স্পর্ধিত উচ্চারণ আজ আমাদের কাম্য। বিশ্বনাটক বহুকেন্দ্রিকতা নিয়ে বিকশিত হবে, সেটা বাস্তব করে তোলার দায়িত্ব নাটকের অজস্র কেন্দ্রের, যা স্ব-স্ব সভ্যতার উত্তরাধিকার বহন করে বৈচিত্র্যের মধ্যে মানবের মিলন ঘটাবে, সভ্যতায় সকলের অধিকার ও অবদান নিশ্চিত করবে।
জয় হোক নাটকের, বিশ্বের ও সর্বদেশের সর্বজাতির সর্বসংস্কৃতির।
